বুধবার, ১০ অগাস্ট ২০২২ | ২৬ শ্রাবণ ১৪২৯

মানবিক পুলিশ-একজন ওসি খালেদ: দুর্গত মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন খাবার নিয়ে



সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার দুর্গত মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন খাবার নিয়ে, সেই সাথে দুর্যোগকালীন মুহুর্তে মানুষকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়েছেন অনেক মানুষজনকে। আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি এই মানবিক কাজ করে যাচ্ছেন, শান্তিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. খালেদ আহমেদ চৌধুরী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৬ জুন বৃহসম্পতিবার ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে সিলেট-সুনামগঞ্জ জেলায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। সেই সাথে ভারি বর্ষণ ও একের পর এক গ্রাম ও শহর পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করে। এম সময় পুরো সিলেট-সুনামগঞ্জ জেলার মানুষের মধ্যে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সসৃষ্টিহয়। অনেকের ঘর-বাড়ি, গবাদিপশু বন্যার পানির স্রোতে ভেসে যেতে থাকে, সেই সাথে গুলার ধান ও অনেক মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এমন সময় সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার ১৫৫টি গ্রামই একের পর এক তলিয়ে যেতে শুরু করে। এমন দুর্যোগকালীন মুহুর্তে শান্তিগঞ্জ থানার অফিসার ইনর্চাজ মো. খালেদ আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে শান্তিগঞ্জ থানা পুলিশের সদস্যরা ‘মানুষের জন্য মানুষ, জীবনের জন্য জীবন, পুলিশ জনতার বন্ধু বাক্য বুকে ধারণ করে নিজের জীবন বাজি রেখে ঝাপিয়ে পড়েন মানুষকে উদ্ধার ও নিরাপন আশ্রয়ে নিয়ে আসতে। প্রতি মুহুর্তেই নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসেন পানি বন্ধি মানুষকে। উপজেলায় বন্যাকালীন মুহুর্তে ১১৭টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়। সেই সাথে অনেকের দু’তলা ও উচু দালান কোটায়ও মানুষ আশ্রয় নিতে থাকাকেন। উপজেলার প্রায় ৯৮% গ্রাম ও হাট-বাজার একেবারেই পানির নিচে তলিয়ে যায়।


শনিবার (১৮ জুন) থেকেই শুরু হয় আশ্রয় কেন্দ্র গুলোতে চরম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। সংকটকালীন মুহুর্তে সুনামগঞ্জ জেলার পুলিশের পক্ষ থেকে মানুষের ত্রাতা হয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে নিজে রান্না করে খাবার নিয়ে বিতরণ করেন শান্তিগঞ্জ থানার অফিসার (ওসি) মো. খালেদ আহমেদ চৌধুরী। প্রতিনিয়তই এই কাজটি চালিয়ে যান তিনি। নৌকা নিয়ে উপজেলার দুর্গম গ্রাম গুলোতে আটকে পরা ও উচ স্থাতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের জন্য রান্না করা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করেন। সেই সাথে শুকনো খাবার, চিড়া, মুড়ি, গুর বিতরণ করেন। গত কয়েকদিন ধরে বিতরণ করছেন, চাল, ডাল, তৈল, লবন, খেজুর, সাবান, গুড়া দুধ সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন তিনি।


সেই সাথে দুর্যোগকালীন মুহুর্তে মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় ৫টি টীমের মাধ্যমে ডাকাতি ও চুরি ঘটনা এরাতে কাজ করছেন থানা পুলিশ। প্রতিনিয়তই রাতে নৌকা ও গাড়ি যোগে উপজেলার প্রতিটি এলাকায় নিয়জিত থাকেন তারা।

আরো জানা যায়, ওসি মো. খালেদ চৌধুরী, ২০১৯-২০২০ সনে সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় অফিসার ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত অবস্থায় বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাসের প্রদুরভাব দেখা দেয়। সেই সময়ও তিনি ঐ এলাকায় মানবিকতার ব্যাপক পরিচয় দিয়েছেন। ফেঞ্চুগঞ্জের মানুষের পাশে দাড়িয়ে ছিলেন তিনি। নিজের জীবন বাজী রেখে মানুষের পাশে দাড়িয়েছিন তিনি। সেই নিজেইর গাড়ি দিয়ে অনেক করোনা রোগিকেই নিয়ে গেছেন হাসপাতালে। অনেকের লাশের দাফনে ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি।

শান্তিগঞ্জ থানায় যোগদান করেন, ১৯ এপ্রিল ২০২২ ইং তারিখে। যোগদানের দেড়-দুই মাসেই মাথায় দেখাদেয় এই ভয়ভহ বন্যা। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায়ও বসে থাকেনি তিনি। এবার নেমে পড়েন মানুষ বাচাঁনোর যুদ্ধে। বিরামহীন ভাবেই মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে তিনি। বন্যা পরিস্থিতির এই ১২ দিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এ পর্যন্ত রান্না করা খাবার তুলে দিয়েছেন ৩ হাজার ২শত মানুষের মাঝে। আর চিড়া, মুড়ি, গুর ও চাল, ডাল, তৈল সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়েছেন ২ হাজার ৩৫০ জন পরিবারকে।


আস্তমা গ্রামের আতাউর রহমান, হাবিবুর রহমান, বজলু মিয়া জানান, ছেলে-মেয়ে নিয়ে বন্যার কারণে কয়েকদিন ধরে ক্ষুধার্থ ছিলাম। আজ শান্তিগঞ্জ থানা পুলিশের মাধ্যমে যে ত্রাণ সামগ্রী পেয়েছি ছেলে মেয়ে নিয়ে কয়েকদিন খেতে পারবো।

দরগাপাশা এলাকার ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা রজব আলী জানান, ভয়াভহ বন্যায় আমার বাড়ি-ঘর পানির নিচে তলিয়ে যায়, তাৎক্ষনিক আমার গ্রামবাসি আমার স্কুলের দু’তলায় আশ্রয় নেই। আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই আমরা চরম ভাবে খাদ্য সংকটে পড়ে ছিলাম। কিন্তু শান্তিগঞ্জ থানা পুলিশ আমাদেরকে পানি বন্দি অবস্থায় আশ্রয় কেন্দ্রে রান্না করা খাবার সরবরাহ করেছেন। সেই সাথে চিড়া, মুড়ি, গুর ও চাল, ডাল, তৈল সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীও আমাদেরকে দিয়েছেন।


শান্তিগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. খালেদ আহমেদ চৌধুরী জানান, আমি যেনে বুঝেই পুলিশে চাকরী নিয়েছি। প্রকৃত অর্থেই পুলিশ জনগণের বন্ধু, বিপদে-আপদে ও দেশ ও মানুষের সেবাই পুলিশের কাজ। আমি সেই কাজটিই করছি, আমার জায়গা থেকে মানুষের জন্য যা যা করা দরকার আমি করে যাচ্ছি। নিজের জীবনবাজি রেখেই প্রতি নিয়তই পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। আমি সেই কাজ করে যাচ্ছি। আমার কাজ থেকে আমি এক পাঁ ও পেছনে সরবো না। আমি যে খানেই গেছি সেখানেই একই কাজ করেছি। গত কয়েকদিনে যে কি পরিমানের ট্রাজেডি গেছে তা বলে বুঝাতে পারবো না। দিন রাত আমাদের থানা পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। ভয়াভহ বন্যায় এই এলাকার মানুষের জানমাল নিরাপত্তায় প্রতিনিয়তই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। মানুষের জন্য কাজ করতে হলে যে কেউই তার জায়গা থেকে করতে পারেন। তবে প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকতে হবে। যে আমি মানুষের জন্যই কাজ করবো, মানুষের পাশে দাঁড়াবো।


শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফারুক আহমেদ জানান, আমার অত্যন্তই ভালো লাগছে যে, এই দুর্যোগকালীন মুহুর্তে মানুষের জানমাল রক্ষার পাশা-পাশি শান্তিগঞ্জ থানা পুলিশ মানুষের পাশে দাড়িয়েছেন। আমি প্রতিনিয়তই দেখছি থানার অফিসার ইনর্চাজ মো. খালেদ আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে উপজেলার কোন না কোন গ্রামেই তারা খাদ্য সহায়তা করছেন। সেই কারণে উপজেলাবাসীর পক্ষ থেকে আমি পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এই দুর্যোগে তারা প্রমান করেছেন, প্রকৃতপক্ষে পুলিশই জনগণের বন্ধু।

সংবাদটি শেয়ার করুন