বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২ | ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

অরণ্যে রোদন



ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ব্যপক বৃষ্টি হয়। উজান থেকে পানির ঢল নামে। সেই পানির তোড় সামলাতে না পেরে ভেঙে ভেঙে পড়ে বাঁধ। তলিয়ে যায় রক্ত পানি করা কষ্টের ফসল। এই গল্প নতুন নয়। প্রতিবছর ধান কাটার আগে আগে গল্পের নতুন পর্ব আপলোড হয় সুনামগঞ্জের হাওরে। সিনেমা দেখার মতো সবাই মিলে দেখি। সংসদেও আলোচনা হয়, মন্ত্রী যান রুটিন ওয়ার্ক পরিদর্শনে, মিটিং করেন। নানান পরামর্শ, ছুটিছাটা বাতিল, কৃষকদের পাশে থাকার সরকারি প্রতিশ্রুতির মুলা ঝুলিয়ে আবার রাজধানীর রাজনীতিতে ফিরেন। ওদিকে মাঠ পর্যায়ে ডিসি, পাউবো কর্তাদের ঘুম হারাম। হাওর থেকে বাঁধ ভেঙে যাবার খবর আসলে ছুটেন। মানুষকে সজাগ-সতর্ক থাকার আহ্বান জারি করেন। ভাঙা বাঁধের পাশে দাঁড়িয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে হুশিয়ারি দেন। তা না হয় দিলেন, কিন্তু
চেরাপুঞ্জির বৃষ্টি থামানো, কিংবা প্রকৃতির বিরুদ্ধে তাদের কিছু করার থাকে না। প্রশাসন কেনো, পুরা দেশবাসী মিলে ধমক দিলেওতো এই পানির ঢল উপরে স্থির থাকবে না, নামবেই। উপর থেকে নীচে নামাই তার ধর্ম। আমাদের কাজ ছিলো নেমে যাওয়া পানিকে একটা শৃঙ্খলায় নিয়ে আসা। এই ঠুনকো বাঁধে সেটা সম্ভব না জেনেও আমরা চুপ থাকি।

প্রতিবছর এইসব বাঁধ ভাঙার তুলকালামের ভিতর মৃদু সুরে শোনা যায় কিছু দাবি। ক্যাপিটাল ড্রেজিং, নদী-খাল খনন, স্থায়ী বাঁধ ইত্যাদি। দাবিগুলো হালকা টোনে ভাসে সুশীলদের মুখে, বড় কোনও আকার তৈরি করে না।

ফসল গিলে খেয়ে পানি নেমে গেলে, কাঁদতে কাঁদতে কৃষকের চোখের জল ফুরিয়ে গেলে, পত্রিকায় খবর ভিতরের পাতায় চলে গেলে, লোকাল সরকারের মাথা থেকেও হাওয়া হয়ে যায় প্রসঙ্গ। কেন্দ্রীয় সরকারতো এসব গোনার টাইম নাই। আবারো আরেক বছরের অপেক্ষা। নতুন পর্ব। ছকে বাঁধা একই গল্প। কৃষকের চোখ দিয়ে পানি হয়ে এভাবেই নামে ফসলের বাৎসরিক আহাজারি।

একটাসময় এইসব বাঁধ ঠিকাদারদের মাধ্যমে হতো। ২০১৭ সালে ব্যপক ফসলহানি হয়। ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়। ঠিকাদানী প্রথা বাদ দিয়ে, নতুন নীতিমালা আসে। পিআইসি গঠন করে কাজ করার কথা বলা হয়। যুক্ত করা হয় জেলা প্রশাসনকে। কিন্তু গলদ থেকে যায়। পিআইসি গঠনে দুই নম্বরী হয়। এই দুই নম্বরিটা কীভাবে হয় সেটা লিখলে অনেক কথা। পিআইসি হবার পর, মনে মনে মিলাদ পড়েন তারা। উজানের ঢল না নামলে বরাদ্দের পুরাটাই লাভ। নামেমাত্র বাঁধকে কাগজে কলমে পূর্ণাঙ্গ বাঁধ গণ্য করে বিল তোলার স্বপ্ন দেখেন। ব্যাপারটা লটারির মতো। বাঁধ না ভাঙলে লটারি জেতা হয়। ভাঙলে ঘুম হারাম।

১৯৮০ সালের পর থেকে হাওরে অনেকবার ফসলডুবির ঘটনা ঘটেছে। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত টানা তিন বছর বেশ কয়েকটি হাওর ডুবে যায়। ২০১০ সালে পুরা সুনামগঞ্জ জেলায় ফসলডুবির ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালের পর বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে অর্থ বরাদ্দ বহুগুণ বাড়ে। বাড়ে বাঁধের দৈর্ঘ্য ও উচ্চতাও। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ নকশায় বাঁধ নির্মাণ ও তদারকিতে ঘাটতি থেকে যায়। লোভের ইন্দুর ঢুকে পড়ে বাঁধে বাঁধে।

এবছর সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ৫০ হাজার ২২০ মেট্রিক টন। এই ফসল রক্ষার জন্য মোট ৭২৭টি ছোট বড় বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সবগুলো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি।

 

প্রশ্ন হলো-
১. প্রতি বছর বাঁধ নিয়ে ভয়-আতঙ্ক, ফসলহানীর পর যে সুপারিশগুলা সরকারের কাছে যায়, সেগুলা আসলে কোথায় যায়?
২. প্রতি বছর বাঁধ ভাঙার পর দুনীতির বিচার হবে বলে যে হুশিয়ারি শুনি, সেই বিচারটা কি হয়?
৩. যে বাঁধগুলো প্রতিবছরই ভাঙে এগুলো প্রতিবছরই তৈরি না করে স্থায়ীভাবে একবারে করা হয় না কেনো? টেকসই প্র্রকল্প নিলে কাদের বেশি ক্ষতি? লটারি লাগানোওয়ালাদের, কৃষকদের নাকি রাষ্ট্রের।
৪. এতো বড় একটা সংকটকে জিইয়ে রাখা হয়, কাদের স্বার্থে? সরকার কেন প্রো-এক্টিভ ভূমিকা নেয় না। শুধু বরাদ্দ বাড়ানো আর নীতমালা বদলানোর অফিসিয়াল কার্যক্রম দিয়ে ফসলতো রক্ষা করা যাচ্ছে না জনাব।
৫. একটা দেশে যদি রাজনৈতিক সরকার থাকে, তাহলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বাইরে কিছুই হয় না। হাওরের ফসল রক্ষায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কেন অনুপস্থিত?
৬. সরকারের টাকার অভাব নাই। একের পর এক মেগা প্রকল্প আসতেছে। হাওরে হবে উড়াল সড়ক। কেমন লাগবে উড়াল সড়কের নীচে বসে হারিয়ে ফেলা ধানের কষ্টে কৃষক যদি কাঁদে?
৭. ভালোমানুষের পারসেপসন নিয়ে আমাদের একজন পরিকল্পনামন্ত্রী আছেন। ৫ জন এমপি, একজন মহিলা এমপি আছেন। অনেক সরকারী উচ্চপদস্ত কমকর্তা আছেন। কিন্তু এতো বড় একটা সংকটের স্থায়ী সমাধান নাই। কেনো নাই, উত্তরও নাই। সবকিছুর উত্তর জানাও যায় না। ভোটের রাজনীতির রাজ্যে কোন টপিকে সরকার কতোটা প্রায়োরিটি দেবে তারাই ভালো জানে। ‘আমাদের পরে দেনা শুধবার ভার।’

সেজুল হোসেন

লেখক, সাংবাদিক, গীতিকার ও সুরকার
৮ এপ্রিল, ২০২২

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •