শনিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২১ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

তাজমহলের পাথরে বানানো রায়পুর বড় জামে মসজিদ



প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুনামগঞ্জ। হাওরের এই জেলা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ঐতিহ্যেও বেশ সমৃদ্ধ। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পাগলা বাজারে গেলে যে কারও চোখে পড়বে শত বছরের পুরোনো দোতলা একটি মসজিদ। স্থানীয় লোকজনের কাছে এটি রায়পুর বড় জামে মসজিদ নামে পরিচিত। মহাসিং নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই স্থাপত্যের নির্মাণকাজে যিনি যুক্ত ছিলেন, তাঁর পূর্বপুরুষদের সুনিপুণ হাতেই নির্মিত হয়েছে জগদ্বিখ্যাত তাজমহল। তাজমহল যে পাথর দিয়ে বানানো হয়েছিল, এটি বানাতেও একই ধরনের পাথর ব্যবহার করা হয়েছে।

১৩৩১ বঙ্গাব্দে স্থানীয় ব্যবসায়ী ইয়াসিন মির্জা ও তাঁর ভাই ইউসুফ মির্জা ভারত থেকে দক্ষ স্থপতি এনে মসজিদটির নির্মাণ শুরু করেন। মসজিদ নির্মাণ নিয়ে লোকমুখে নানা জনশ্রুতি থাকলেও পরিবারসূত্রে জানা যায়, ইয়াসিন মির্জার বাবা আদিল হাজি পরগনার মধ্যে একমাত্র হাজি ছিলেন। তিনি নামাজের জন্য বর্তমান মসজিদের জায়গায় একটি টিনশেড ঘর তৈরি করেন। পরে এখানেই দুই ভাই মিলে মসজিদ বানানোর উদ্যোগ নেন।

মসজিদের নির্মাণকাজ চলে ১০ বছর ধরে। ৬৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও বারান্দাসহ ২৫ ফুট প্রস্থের এ মসজিদের উচ্চতা গম্বুজসহ ৪০ ফুট। ৬টি স্তম্ভের ওপর ৬টি মিনার, ৩টি বিশাল গম্বুজ এবং ছোট সাইজের আরও ১২টি মিনার। বাইরের চেয়ে ভেতরটা বেশি নান্দনিক। নামাজের জন্য নির্ধারিত মূল স্থান দোতলায়। মিহরাব অংশে জমকালো পাথর কেটে আকর্ষণীয় ডিজাইন করা হয়েছে। পুরো মসজিদের চারপাশে তিন ফুট উচ্চতা পর্যন্ত যে কারুকার্যখচিত টাইলস লাগানো হয়েছে, সেগুলোও উঁচুমানের স্থাপত্যশৈলীর ইঙ্গিত দেয়। টাইলসগুলো আনা হয়েছিল ইতালি, জার্মানি ও ইংল্যান্ড থেকে। প্রতিটি প্রবেশদ্বারে পাথরখচিত খিলান মসজিদটিকে বেশ দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। নিচতলার ছাদ ঢালাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে রেলের স্লিপার। ছাদ ও গম্বুজের চারপাশে পাথর খোদাই করা পাতার ডিজাইন গ্রামীণ ঐতিহ্যের জানান দেয়। দোতলার মেঝেতে রয়েছে দুর্লভ শ্বেতপাথর। চারপাশে ব্লকে আছে ব্ল্যাক স্টোন বা কালো পাথর, যা আরও বেশি দুর্লভ। এগুলো আনা হয়েছে ভারতের জয়পুর থেকে। মসজিদ নির্মাণে ব্যবহৃত এ ধরনের পাথর একমাত্র তাজমহলে ব্যবহার করা হয়েছে।

দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদের ভেতরে ঢুকতে হয় উত্তর পাশের গেট দিয়ে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, রডের ব্যবহার ছাড়াই সম্পূর্ণ ইটের ওপর নির্মিত স্থাপনাটি। নির্মাণকাজ করা মিস্ত্রিরা সবাই ভারতীয়। মূল স্থপতি মুমিন আস্তাগারের পূর্বপুরুষ ভারতের তাজমহল নির্মাণে কাজ করেছেন।

ঐতিহ্যবাহী পাগলা বড় জামে মসজিদটি অযত্নে ও অবহেলায় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সরকারের তরফ থেকে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটি পর্যটনশিল্পে একটা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। আর যদি অবহেলার ধারাবাহিকতায় দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়তে থাকে ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয়, তবে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী এ মসজিদটি আর না-ও দেখা যেতে পারে। কালের বিবর্তনে যাতে হারিয়ে না যায়, সে জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন ইয়াসিন মির্জার প্রপৌত্র লালন মির্জা ও মনজুর হায়দার।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •