সোমবার, ১৫ অগাস্ট ২০২২ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯

নিজ হাতে হিন্দু ‘মেয়ের’ বিয়ে দিলেন মুসলিম ‘বাবা’



দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার জয়কলস গ্রামের জয়ন্তি বিশ্বাস। শৈশবেই মা-বাবাকে হারান। শুক্রবার রাতে হিন্দু শাস্ত্রমতে তার বিয়ে হয়। বিয়ের সার্বিক আয়োজনে পাশে ছিলেন জয়ন্তির ধর্মপিতা পল্লী চিকিৎসক আব্দুন নূর ময়না।

জয়ন্তির বাড়ি দক্ষিণ সুনামগঞ্জ এবং আব্দুননূর ময়নার বাড়ি একই উপজেলার সদরপুর গ্রামে। ময়নার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা সদরের শান্তিগঞ্জে ফার্মেসি রয়েছে।

জয়ন্তির বাবা হরকুমার বিশ্বাস এবং মা সুরধ্বনি বিশ্বাস মারা যান ১২ বছর আগে। তারা জীবিত থাকতেই তার বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে যায়। মৎসজীবী ভাই প্রফুল্ল বিশ্বাস সংসার চালান। হরকুমার ও সুরধ্বনি মারা যাবার পর জয়ন্তি পল্লী চিকিৎসক আব্দুন নূর ময়নাকে বাবা ডাকে। সেই থেকে ময়নাও তাকে সন্তানের মতোই স্নেহ করেন। বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়ান।

শুক্রবার রাতে জয়ন্তির বিয়ে হয় জেলার ছাতক উপজেলার মর্জা গ্রামের রাজিন্দ্র বিশ্বাসের ছেলে গৌরাঙ্গ বিশ্বাসের সঙ্গে। বিয়েতে সাধ্যমতো সহযোগিতা করেন আব্দুননূর ময়না। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর মেয়ে জয়ন্তিকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ফেসবুকে ছবি পোস্ট করে স্ট্যাটাস দেন আব্দুননূর ময়না।

এতে তিনি লেখেন, মেয়েটির নাম জয়ন্তি। পিতৃহারা মেয়েটি ছোটবেলা থেকেই আমাকে বাবা বলে ডাকে। আমার কোনো কন্যাসন্তান না থাকায় ওকে আমার নিজের মেয়ে বলেই জানি। সুখে-দুখে সব সময় পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আদর-স্নেহ-ভালবাসা দেওয়ার চেষ্টা করেছি সব সময়। বাবা মুসলিম, মেয়ে সনাতন ধর্মবলম্বী হলেও আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও পবিত্র। মেয়েকে বেশি পড়াশুনা করাতে না পারলেও একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। আজ মেয়েটির বিয়ে হলো, ভালো পাত্রের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে পেরে আমি আনন্দিত। সবাই আমার মেয়ের সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য দোয়া করবেন।

আব্দুননূর ময়নার এই স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর স্থানীয় সাংবাদিকরা খোঁজ নিতে জয়ন্তির জয়কলস-এর বাড়িতেও যান। জয়ন্তির কাকা সুধা রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, ‘আব্দুননূর ময়নার (ময়না ডাক্তারের) প্রতি কৃতজ্ঞ আমরা। মেয়ের মতোই দেখেছে সে জয়ন্তিকে। বিয়েতেও সাধ্যমত সহযোগিতা করেছে। একই কথা বলেন জয়ন্তির ভাই প্রফুল্ল বিশ্বাসও।

শোভন দেব নামের একজন তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, মেয়েটির বাবা ও মা গত হয়েছেন অনেক আগেই। অসহায় পরিবারটির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিলো যখন, ঠিক তখনই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন ডা. ময়নাভাই। পরিবারটির দেখাশুনা করতেন প্রতিনিয়ত। কোনোদিন জয়ন্তিকে বুঝতে দেননি তার বাবার অভাব। দায়িত্ব নিয়ে একজন সুপাত্রের হাতে তুলে দিয়েছেন মেয়েকে। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে যখন দক্ষিণ এশিয়া জ্বলছে, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি চলছে- তখন এমন মহৎ কাজ করলেন ময়না ডাক্তার….। এভাবেই অসাম্প্রদায়িকতা সহস্রবছর বেঁচে থাকুক।

আব্দুননূর ময়না এ প্রতিবেদককে বলেন, জয়ন্তির বিয়েতে আবেগপ্রবণ ছিলাম আমি। মেয়ের বিয়েতে বাবার যেমন হয়। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তোলা ছবি দিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। এই স্ট্যাটাসকে সবাই এমন গুরুত্ব দেবেন ভাবিনি। আমার কাছে মনুষ্যত্বই পরমধর্ম। আমি ইসলামের অনুসারী। অতএব স্রষ্টার পরেই মানুষের গুরুত্ব আমার কাছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন