বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২ | ২ ভাদ্র ১৪২৯

ড. ইউনুসের জন্য পদ্মাসেতুর অর্থায়ন বন্ধ করে বিশ্বব্যাংক: প্রধানমন্ত্রী



ড. মুহম্মদ ইউনুসের প্ররোচণায় বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতু নির্মাণের অর্থায়ন বন্ধ করে দেয় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেছেন, ড. ইউনুস বেআইনিভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদে ছিলেন। তাকে বলার পরও তিনি সরলেন না। উল্টো সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করলেন। মামলায় হেরে আমেরিকায় যান। সেখানে তার প্ররোচণায় তখনকার বিশ্বব্যাংক প্রধান এ প্রকল্পের অর্থ বন্ধে অর্ডার দিয়ে যান।

রোববার (১৪ অক্টোবর) মুন্সিগঞ্জের মাওয়াপ্রান্তে পদ্মাসেতুর নাম ফলক উন্মোচনকালে এক সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের আইনে আছে, ৬০ বছর পর্যন্ত ব্যাংকের এমডি থাকতে পারবেন। কিন্তু ড. ইউনুস কোনো অনুমোদন ছাড়াই ৭০ বছর পর্যন্ত অর্থাৎ ১০ বছর বেশি এমডির পদে থাকেন। সব সুযোগ সুবিধাও ভোগ করেন। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী- এই দুইজন ড. ইউনুসের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাকে বলা হয়, আপনি ব্যাংকের এমিরেটাস অ্যাডভাইজার হিসেবে থাকেন।’

‘কিন্তু তিনি আমাদের কথা শুনলেন না। তিনি দুটি মামলা করলেন। কোর্ট তাকে বললো, আপনার এমডি থাকা আইন অনুমোদন করে না। আপনি এ পদে থাকতে পারবেন না।’

তিনি বলেন, ওই সময় হিলারি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আমায় ফোন করলেন। টনি ব্লেয়ার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার স্ত্রী শেরি ব্লেয়ারও আমাকে ফোন করলেন। আমি তাদের বললাম- এটা তো আইনে পড়ে না। আমরা তাকে সম্মানজনক প্রস্তাব দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি রাখলেন না। এটা কোর্টের বিষয়, সরকারের পক্ষ থেকে সেখানে কিছু বলাও হয়নি। তিনিই মামলা করে হেরেছেন।

‘আমাকে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ থেকে ইউনুসকে সরালে পদ্মাসেতু হবে না। নোবেল পেয়ে গেছেন কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির পদের লোভ ছাড়তে পারেন না তিনি। এরপর একটি পত্রিকার সম্পাদক ও ইউনুস আমেরিকায় যান এবং হিলারি ক্লিনটনকে অনুরোধ করেন। তখন বিশ্বব্যাংকের প্রধান তার শেষ সময়ে পদ্মাসেতু প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধের অর্ডার দিয়ে যান।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মাসেতুর অর্থায়ন বন্ধের পেছনে ছিলেন ড. ইউনুস। তার মধ্যে যদি দেশপ্রেম থাকতো তাহলে কী করে তিনি দেশের এত বড় ক্ষতি করেন?

‘কিন্তু অর্থায়ন বন্ধ করে তারা দুর্নীতির ধোঁয়া তুললো। তাদের একজন অফিসার বাংলাদেশে এসে বলে গেলেন, পদ্মাসেতুতে দুর্নীতি হয়েছে। আমরা প্রমাণ চাইলাম। কিন্তু তারা তা দেখাতে ব্যর্থ হয়। ঘোষণা দিলাম নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, এই প্রকল্প নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে নানা দুর্নাম রটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমার ছেলে জয়কে আমেরিকার তদন্ত সংস্থা ডেকে নিয়েছে। জয় বলেছে- আপনারা দেখেন কোথায় কি হয়েছে? রেহানার দিকেও আঙুল তোলা হয়েছে। কিন্তু তারা কোথায়ও কিছু পেলো না।

‘এরপর সব কিছু ভুল প্রমাণিত করে কানাডার ফেডারেল কোর্ট বলে দিয়েছে, এ প্রকল্পে কোনো দুর্নীতি হয়নি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মাসেতু প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধের পেছনে যে অপমান করা হয়েছে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে হেয় করা হয়েছে অথচ এর পেছনে উসকানিদাতা আমার দেশেরই লোক।

‘এদের কোনো দেশ প্রেম থাকতে পারে না। গরিবের টাকায় সুদ খেয়ে যারা বড় লোক হয় তারা দেশের মানুষকে কখনও ভালোবাসতে পারে না।’

শেখ হাসিনা বলেন, নিজেদের অর্থায়নে পদ্মাসেতু করার ঘোষণা দেওয়ার পর দেশের মানুষ আমাকে সাহায্য করেছে। অনেকেই মনে করতো বাংলাদেশ একটি দুর্যোগের দেশ, তাদের পক্ষে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ছাড়া পদ্মাসেতু করা সম্ভব নয়।

‘আমি একটা কথা বিশ্বাস করি- বাংলার জনগণের ওপর আমার ভরসা ছিলো। সেটা নিয়েই আমি এ প্রকল্পের কাজ শুরু করেছি। এখন পদ্মাসেতুর ৬০ শতাংশ কাজ হয়েছে। নদী শাসন করে সেতুকে ছোট করতে চাইনি। যতটুকু আছে সেটাই করা হচ্ছে। এখন ৭৫০ মিটার সেতু দৃশ্যমান হয়েছে। এটা কঠিন কাজ। যারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের ধন্যবাদ জানাই।’

তিনি বলেন, জাতির পিতা আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করা, স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করা, উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা আমার একমাত্র লক্ষ্য, আমার একমাত্র চাওয়া।

‘আল্লার কাছে দোয়া করবেন, এই পদ্মাসেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে- বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যারা নষ্ট করতে চেয়েছিল, বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে যারা বাধা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষের দারিদ্র্যসীমা অতিক্রমের পথ যারা বাদ বন্ধ করতে চেয়েছিল তাদের উপযুক্ত জবাব আমরা দেবো।’

শেখ হাসিনা বলেন, পাশাপাশি বাংলাদেশে মানুষের জন্য সুন্দর জীবন ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত জীবন, জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা আমরা গড়ে তুলবো। আমরা ইতোমধ্যে সব সময় ৮৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি, পদ্মাসেতু নির্মাণ হলে আরও ৮ দশমিক ২ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে।

‘বলা যায়, আমরা দুই ভাগ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারব। পদ্মাসেতু নির্মাণ হলে আমাদের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ উন্নীত করতে খুব একটা কষ্ট হবে না।’

সুধী সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ওবায়দুল কাদের। এ সময় স্বাগত বক্তব্য রাখেন রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক। আর অন্যদের মধ্যে সেনাবাহিনী প্রধান আজিজ আহমেদও বক্তব্য দেন।

এদিকে স্বপ্নের পদ্মাসেতুর মাওয়া প্রান্তে নামফলক উন্মোচন ও রেলসংযোগ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দেশের বৃহত্তম এ প্রকল্পের নির্মাণ কর্মযজ্ঞ সরেজমিন পরিদর্শন করতে রোববার (১৪ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১০টায় ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে রওয়ানা দিয়ে পদ্মাসেতুর মাওয়া প্রান্তে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী।

সেখান থেকে পদ্মাসেতুর রেলসংযোগ প্রকল্পের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন (মাওয়া প্রান্ত) করেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে তিনি পদ্মাসেতুর নামফলক উম্মোচন (মাওয়া প্রান্ত) এবং মূল নদীশাসন কাজ সংলগ্ন স্থায়ী নদীতীর প্রতিরক্ষামূলক কাজেরও উদ্বোধন করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী মাওয়া অংশে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি এবং এন-৮ মহাসড়কের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করেছেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, নৌমন্ত্রী শাজাহান খান, বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এ, কে, এম শাহজাহান কামাল ও সেনা বাহিনী প্রধানসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এরপর পদ্মাসেতুর মাওয়া টোলপ্লাজা সংলগ্ন গোলচত্বরে সুধী সমাবেশে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। মাওয়া প্রান্তের কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী পদ্মাসেতুর শরীয়তপুর জেলার জাজিরা প্রান্তে যাবেন।

সে প্রান্ত থেকেও তিনি পদ্মাসেতু রেলসংযোগ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন (জাজিরা প্রান্ত) এবং পদ্মাসেতুর নামফলক উম্মোচন (জাজিরা প্রান্ত) করবেন।

বিকেলে প্রধানমন্ত্রী মাদারীপুরের শিবচর কাঁঠালবাড়ীর ইলিয়াছ আহমেদ চৌধুরী ফেরিঘাটে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় যোগ দেবেন। জনসভা শেষে বিকেলেই প্রধানমন্ত্রীর ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন