বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২ | ২ ভাদ্র ১৪২৯

‘হাওয়া ভবন’ ঘিরে শ্বাসরুদ্ধকর ভয়



দুপুর আড়াইটা। বনানী ১৩ নম্বর রোডের ‘ডি’ ব্লকের ৫৩ নম্বর ভবনের প্রধান ফটক। গেটের ভেতর দিকে তিনজন লোক দাঁড়িয়ে আছেন। একজন নিরাপত্তাকর্মী এগিয়ে এলে কালের কণ্ঠ প্রতিনিধি জানতে চান, একসময় এখানেই হাওয়া ভবন ছিল কি না। বয়স্ক মানুষটি কিছুটা ভয় পেয়ে বলেন, ‘আগে ছিল, এখন আর নেই। এ বিষয়ে আমাকে আর কোনো প্রশ্ন করবেন না।’ কথাটি বলেই, তিনি চোখ দিয়ে পাশের একজনকে দেখান। নাম তাঁর মোহাম্মদ সায়মন, ভবনের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিও ‘হাওয়া ভবন’ নামটি শুনে চমকে ওঠেন। মোহাম্মদ সায়মন বলেন, ‘এখানে হাওয়া ভবন-টবন নেই। অনেক আগে যে পুরাতন ভবনটি ছিল তার নাম ছিল হাওয়া ভবন। ভাই, এই নামটি নিয়ে সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়।’ ভবনটি ঘুরে দেখতে চাইলে তিনি এক বাক্যে না করে দিয়ে বলেন, ‘ভাই, এমনিতেই ভয়ে আছি। তার উপর আপনে ঝামেলা কইরেন না। আপনে আর কোনো প্রশ্নও কইরেন না।’ কিছুক্ষণ তিনি চুপ থেকে আবার বলেন, ‘এমনিতেই সরাক্ষণ ভয়ে থাকি। পুলিশ, র‌্যাবসহ গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন প্রায়ই এসে খোঁজ নেয়—রাজনৈতিক নেতাদের লোকজন এসে কোনো বৈঠক করে কি না। বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের সম্পর্কে খোঁজ নেন তাঁরা। এখন আরো বেড়েছে। রাতে ঘুমাতে পারি না।’ রাজনৈতিক নেতারা আসলেই আসেন কি না জানতে চাইলে তিনি রেগে বলেন, ‘আবার প্রশ্ন করছেন? এটা এখন আর রাজনৈতিক ভবন নয়। আগের ভবন ভেঙে নতুন ৯ তলা ভবন করা হয়েছে। এখন এখানে বিটিআই, কেয়া কসমেটিকসসহ দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীরা থাকেন। বিদেশি দূতাবাসের অফিসও রয়েছে এখানে।’

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বনানী এলাকায় বহুল আলোচিত ‘হাওয়া ভবন’ অনুসন্ধানে গিয়ে এমনই পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। ভবনটির নিচতলার প্রধান ফটকের পাশে দেয়ালে ইংরেজিতে নেমপ্লেটে লেখা ধুঁত্ব। এলাকাটি অনেকটাই নিরিবিলি। জানা যায়, হাওয়া ভবনের স্থানটিতে ৯ তলা ভবন তুলে দেশি-বিদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে অ্যাপার্টমেন্ট হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছেন ভবন মালিক।

পাশের ভবনের ম্যানেজার মেহেদি বলেন, ‘আমি এখানে দেড় বছর ধরে আছি। শুনেছি একসময় এখানে হাওয়া ভবন ছিল। তখন বিএনপি নেতা তারেক জিয়ার ভবন ছিল এটি। এখানে অনেক দুর্নীতির সিদ্ধান্ত হতো। টেলিভিশনের খবরে শুনেছি, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বৈঠকও তখন হাওয়া ভবনে হয়েছিল।’

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, আসামি মাওলানা আব্দুস সালাম, মাওলানা তাজউদ্দিন, মুফতি হান্নান, মাওলানা আব্দুর রউফ ও আব্দুল মাজেদ ভাট প্রথমে মোহাম্মদপুরের সাতমসজিদে বসে সিদ্ধান্তে আসেন, তাঁদের জঙ্গি তৎপরতার পথে ‘প্রধান বাধা’ আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে এর প্রধান শেখ হাসিনা। তাঁরা মুরাদনগরের এমপি মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের সহযোগিতায় ২০০৪ সালের প্রথম দিকে হাওয়া ভবনে গিয়ে মামলার অন্যতম আসামি তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। তাঁরা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যাসহ বিভিন্ন অপারেশন চালানোর জন্য সহযোগিতা চান। তারেক রহমান উপস্থিত সবার সামনে তাঁদের কাজকর্মে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাড়ে পাঁচ কাঠা জমির ওপর গড়া একসময়কার হাওয়া ভবন ও বর্তমান বহুতল ভবন একই মালিকের। নাম আসেক আহমেদ। ১৯৯৪ সালে লন্ডনপ্রবাসী সিলেটি ব্যবসায়ী আসেক আহমেদ শিল্প ব্যাংকের সাবেক জিএম নুরুল হুদার কাছ থেকে বাড়িটি কেনেন। আসেক আহমেদের কাছ থেকে বাড়িটি বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় হিসেবে ভাড়া নেয়। তবে মূলত তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাড়িটিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলত। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের পেছনে হাওয়া ভবনের ভূমিকা ছিল। এরপর হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক দুর্নীতির কার্যক্রম নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে তারেক রহমান গ্রেপ্তার হলে হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বাড়ির মালিকও তখন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে তিনি আর বাড়িটি ভাড়া দেবেন না

সংবাদটি শেয়ার করুন