রবিবার, ১৪ অগাস্ট ২০২২ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯

প্রসঙ্গ সড়কে প্রাণহানি : প্রশাসনিক আইন ও সচেতনতার অভাব প্রকট



সারা দেশে সড়ক-মহাসড়ক গুলো যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশব্যাপি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর থেকে সড়ক যেন আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে। সারা দেশেই মৃত্যুর মিছিল চলছে। মারা যাচ্ছে মানুষ। প্রতিদিন শিরোনাম হচ্ছে। সর্বত্র চলছে আন্দোলন, প্রতিবাদ। নানা আওয়াজ। কিন্তু কিছুতেই ছোট হচ্ছে না লাশের সারি। সড়কে হত্যা থামছেই না। সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে ক্রমেই। এর পেছেনে খতিয়ে দেখা গেছে সর্বত্র প্রশাসনিক আইনের অনুপস্থিতি ও দায়িত্বশীলতা এবং জনসচেতনতার প্রকট অভাব রয়েছে।

এ থকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে যে সকল বিষয়গুলোর উপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে তা হলে-
১. চালকের অসাবধানতা ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ী চালানোর মনোভাব পরিহার করতে হবে।
২.নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বা তন্দ্রা অবস্থায় গাড়ী চালানো বন্ধ রাখতে হবে।
৩.অধিক সংখ্যক যাত্রী উঠানো যাবেনা।
অনভিজ্ঞ ও অদক্ষ ড্রাইভার দ্বারা গাড়ী চালানো যাবেনা।
৪.অনুপযুক্ত আবহাওয়ায় গাড়ী চালানো যাবেনা।
৫.পথচারীদের বেপরোয়া চলাচল বন্ধ করতে হবে।
৬.ত্রুটিপূর্ণ রাস্তা ঘাটে সাবধান হয়ে গাড়ী চালাতে হবে।
৭.ট্রাফিক চিহেৃর অনুপস্থিত ও যত্রতত্র পার্কিং রোধ করতে হবে।
৮. প্রশাসনের অবহেলা ও অব্যবস্থা প্রতিহত করতে হবে।
৯.পরীক্ষা নিরীক্ষা না করে অবাধে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
১০. যান্ত্রিক সমস্যা জনিত গাড়ী ও ফিটনেস বিহীন গুলো সড়কে না নামানো।
১১.শারীরিক অক্ষমতা ইত্যাদি।
বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। আর এর তুলনায় সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থা যথোপযুক্ত নয়। যার জন্য প্রতিনিয়তই ঘটছে নানা অনাকাংখিত সড়ক দুর্ঘটনা। আর এর শিকার হচ্ছে সর্বস্তরের জনগণ। ২০১৭ সালে বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে বড় বড় শহর ও হাইওয়েতে। ছোট ছোট অবৈধ যানবাহন যেমন: ভ্যান, রিকশা, নসিমন, অটোরিকশা ইত্যাদি চলাচল করে। এখানেও দুর্ঘটনা ঘটে। সড়কে ক্রমবর্ধমান এই মৃত্যুর মিছিলের জন্য দায়ী ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা, নির্দিষ্ট স্থান ব্যতিরেকে যেখানে সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী উঠানো এবং নামানো, ওভারটেকিং করা, পাল্টাপাল্টি ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত যাত্রী ও মাল বোঝাই, গাড়ির ছাদে যাত্রী বহন করা, মালিকের অতিরিক্ত আয়ের জন্য ড্রাইভারকে নির্দোষ প্রমাণ, অশিক্ষিত ও অদক্ষ ড্রাইভার নিয়োগ, হেলপার দিয়ে গাড়ি ড্রাইভিং করানো ইত্যাদি। এজন্য বিশেষ করে গাড়ির গতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সক্রিয় হতে হবে। শিক্ষিত চালক নিয়োগ করতে হবে ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে। জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এছাড়া সড়কের ত্রুটিগুলো অচিরেই দূর করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট নানা জন নানা কথাই বলছেন। কিন্তু দায় নিচ্ছেন না কেউ। সড়কে ক্রমবর্ধমান এই মৃত্যুর জন্য আপনি কাকে দায়ী কে? নেই এমন প্রশ্নের উত্তরও কারো কাছে। প্রতিনিয়ত সড়কে প্রাণ গেলেও পরিবার পাচ্ছেনা এর ক্ষতিপূরণ। সড়কে লাশের মিছিল বাড়ছে। কিন্তু এই মৃত্যুর দায় কেউই নিচ্ছেন না। এর বিচার নেই। নেই জবাবদিহিতাও। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অনেক চালক কম বয়সী, তার ওপর তারা অনেকেই মাদকাসক্ত ও লাইসেন্সবিহীন। এদের প্রতিরোধ না করা পর্যন্ত এই মৃত্যুর সংখ্যা কমবে না। শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করছে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন করছে সেটা যৌক্তিক। তাদের ফুঁসে উঠার যথেষ্ট কারণ আছে। আমাদের দেশে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা বহুদিন ধরে ঘটে আসছে। এজন্য বহু লেখালেখি হচ্ছে। চলছে প্রচার-প্রচারণা, মিডিয়া ও ঘরে-বাইরে চলছে আলাপ-আলোচনা। এরকম বহু কিছুই চলছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই কোনো কিছু হচ্ছে না। এ যেন নিয়ম না মানার প্রতিযোগিতা চলছে। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় এই যে, ৪৭ বছর আগে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু আমরা এখনো সুশৃঙ্খল জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারিনি।
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা শহর ও সারা দেশে। এতে ছাত্রদের ৯ দফা দাবির আন্দোলন এখন তুঙ্গে। এতে উত্তাল রাজপথ। সড়কে ক্রমবর্ধমান এই মৃত্যুর মিছিলের জন্য দায়ী শ্রমিক সংগঠনসমূহ। কেননা শ্রমিকদের নানা সংগঠন চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত। এই টাক চালক, কন্ট্রাক্টর ও হেলপারের বেতনসহ রুট খরচ, পার্কিং চাঁদা, টার্মিনাল খরচ, মাস্তান ভাতা, পুলিশের বখরাসহ নানাবিধ খাতে ব্যয় করা হয়। এজন্য সড়ক নিরাপত্তার ক্রমশ অবনতি হয়েছে। অন্যদিকে গাড়ি চালান ড্রাইভার লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভার অথবা হেলপার। দায়সারাভাবে চলছে এই পরিবহন ব্যবস্থা। খতিয়ে দেখাগেছে, যখন কোনো বাসে দুর্ঘটনা ঘটে, তখন এর দায় কেউ নিতে চায় না। যদি সরকার বেশি কিছু বলতে চায়, তাহলে সারা দেশে পরিবহন শ্রমিকেরা ধর্মঘট শুরু করে দেয়। আসলে অনেক চালকের ঠিকমতো ড্রাইভিং লাইন্সেস নেই। কিন্তু তাদের দেখার মতো কেউ নেই। যখন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তখন উপরের মহলের ফোনে ছাড়া পেয়ে যায়। যখন একজন দক্ষচালক গাড়ি চালাবে, সে অনেক কিছু হিসেব করে গাড়ি চালাবে। অনেকেই ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালায়। যা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ।
বলা বাহুল্য যে সকলের মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যু কারোরই কাম্য নয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে চালক ৮০ লাখ, লাইসেন্স ১৬ লাখ। এই অবৈধ ও অদক্ষ চালকরা দায়ী সড়ক দুর্ঘটনার জন্য। দায়ী অতিলোভী মালিকপক্ষও। আর বেপরোয়া পথচারীদের অসচেতনতাও কম দায়ী নয়। এই সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে সবারই দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন