রবিবার, ১৪ অগাস্ট ২০২২ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯

দ্রুত বিকশিত হচ্ছে টার্কির খামার



বাংলাদেশের অনুকোল আবহাওয়া ও পরিবেশে পশুপাখি পালন অন্যান্য দেশের তুলনায় সহজ। টার্কির ও সেরকম একটি সহনশীল পাখির জাত, যারা যে কোনো পরিবেশ দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে। টার্কি পাখির খাদ্য সবুজ ঘাস, শাক, লতাপাতা যা বাংলাদেশে সহজলভ্য। এই সুবাদে দেশে গড়ে উঠতে পারে অসংখ্য ছোট-বড় টার্কির খামার। আশার খবর হচ্ছে- টার্কির পালনে তরুণ সমাজে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ করা গেছে। তারই প্রতিফলন হিসেবে আমরা দেখতে পাচ্ছি দেশে ব্যক্তি উদ্যোগে তরুণরা ছোট-মাঝারি খামারে টার্কির পালন করছেন।

উৎপাদন ব্যয় কম এবং স্বল্প বিনিয়োগে কম সময়ে অধিক মুনাফা অজের্নর সম্ভাবনা থাকায় বাংলাদেশেও দ্রুত বিকশিত হচ্ছে টার্কির পালন। মুরগির মতো দেখতে কিন্তু আকৃতিতে অনেক বড় গৃহপালিত পাখিটির নাম টার্কির। মেলিয়াগ্রিস পরিবারের এক ধরনের বড় আকৃতির পাখি এটি। গৃহপালিত টার্কির ও মূলত এ প্রজাতিরই। বাচ্চা অবস্থায় এগুলো দেখতে অনেকটাই মুরগির বাচ্চার মতো। দুইভাবে টার্কির পালন করা যায়- ১. মুক্তচারণ পালন পদ্ধতি ও ২. নিবিড় পালন পদ্ধতি।

আত্মকমর্সংস্থানে নতুন আশাবাদ

অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারের ফলে শিক্ষিত তরুণরা টার্কির পালনে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। বিচ্ছিন্নভাবে বিকশিত খামারিরা টাকির্র মাংসের বাজার সম্প্রসারণে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন এই শিল্প সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে বেকারত্ব দূরীকরণ এবং দারিদ্র্য বিমোচন হওয়ার পাশাপাশি আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় জোরালো অবস্থান করে নেবে টাকির্র মাংস। ঢাকার সাভার, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নওগাঁ, খুলনা, চট্টগ্রাম, যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, ফেনীসহ বিভিন্ন জেলায় ছোট ছোট খামারের পাশাপাশি বড় খামারগুলোতে সফলভাবে টার্কির লালন-পালন করছেন খামারিরা। খামারিদের সফলতা দেখে নতুন নতুন অনেক উদ্যোক্তা এ নিয়ে উৎসাহ দেখাচ্ছেন। এতে বহু লোকের কমর্সংস্থানও হচ্ছে। জানা গেছে, টার্কির জন্য কৃত্রিম খাবারের প্রয়োজন নেই। এ কারণে টার্কির খাবারের ব্যয়ও খুবই কম। সাধারণ প্রাকৃতিক সবুজ ঘাস ও লতাপাতা এবং শাকসবজি টার্কির পছন্দের খাবার। এ ছাড়া দানাদার খাবার রাখতে হবে। দেশীয় মুরগির মতো ঘরেও টার্কির লালন-পালন করা যায়। পুষ্টিকর ও সুস্বাদু হওয়ায় পোল্ট্রির পাশাপাশি টার্কির মাংসও খাদ্য তালিকায় আদর্শ মাংস হিসেবে ঠাঁই করে নিতে পারলে এর বাজার সম্ভাবনা দ্রুত বাড়বে।

গবেষণায় দেখা গেছে, টার্কির মাংসে প্রোটিনের পরিমাণ শতকরা ২৪-২৫ ভাগ। অন্য প্রজাতির মুরগির মাংসে প্রোটিন ২২ ভাগ এবং গরুর মাংসে ২০ ভাগ। অন্যদিকে খাসির মাংসে কোলেস্টেরল রয়েছে শতকরা ২৩ ভাগ। গরুর মাংসে শতকরা ২৪ ভাগ। মুরগির মাংসে ৫ ভাগ। টার্কির মাংসে কোলেস্টেরল শূন্য ভাগ। টার্কির খামার সম্প্রসারণে সরকারের প্রাণিসম্পদ বিভাগের উল্লেখযোগ্য ভুমিকা না থাকলেও টার্কির খামারি ও আগ্রহীদের ব্যাপক তৎপরতার কারণে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে টার্কির পালন। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে এখন দরকার সরকারের প্রণোদনা।

দেশি মুরগির মতো পালন করা যায়

টার্কির পালনে লাভ বেশি। ঝামেলাহীনভাবে দেশি মুরগির মতো পালন করা যায়। একটি ছাগলের তুলনায় একটি টার্কির থেকে বেশি মাংস পাওয়া সম্ভব। টার্কির মাংস সুস্বাদু এবং মাংস উৎপাদন ক্ষমতাও ব্যাপক। এক বছরেই একটি টার্কির ওজন হয় ১২-১৪ কেজি। আবার অন্যান্য পাখির তুলনায় টার্কির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। ব্রয়লার মুরগির চেয়েও অনেক দ্রুত বাড়ে। এরা দানাদার খাদ্যের পাশাপাশি শাক, ঘাস, লতাপাতা খেতেও পছন্দ করে। তাই তুলনামূলক টার্কির পালনে খরচ বেশ কম। কারণ গৃহপালিত মুরগির মতোই মুক্ত অবস্থায় টার্কির পালন করা যায়। আর আমাদের দেশে বিশেষত গ্রামাঞ্চলে ঘাস আর লতাপাতার অভাব নেই। টার্কির মুরগি মাত্র ৬ মাসে ডিম দেয়। ডিমের আকার আমাদের দেশের হাঁসের ডিমের আকৃতির মতো হয়ে থাকে। ৬০-৭০ শতাংশ টার্কির মুরগি বিকালে ডিম দেয়। টার্কির একটি ডিম বিক্রি হয় ২০০ টাকায়। ডিম থেকে বের হওয়ার পরই টার্কির বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে ৬০০-৭০০ টাকায়। দুই সপ্তাহের বাচ্চার দাম ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা। দুই মাসে প্রতিটি টার্কির বিক্রি করা যায় ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকায়। তিন মাস বয়সী টার্কির বিক্রি করা যায় সাড়ে তিন হাজার টাকায়। ডিম দেয়ার সময় ৬ থেকে ৭ হাজার টাকায় প্রতিটি টার্কির বিক্রি হয়।

জনপ্রিয় হচ্ছে টার্কির মাংস

জানা গেছে, পোল্ট্রির ১১টি প্রজাতির মধ্যে টার্কিরও একটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টার্কির মাংস বেশ জনপ্রিয় ও দামি খাদ্য। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই টার্কির গৃহপালিত পাখি হিসেবে পালন করা। তবে প্রথম গৃহে টার্কির পালন শুরু হয় উত্তর আমেরিকায়। পরে ১৫৫০ সালে ইউলিয়াম স্টিকলেন্ট নামে এক ইংরেজ নাবিক প্রথম তুরস্ক থেকে এই জাতের মুরগি মধ্য ইউরোপে নিয়ে আসেন। ফলে তুরস্কের নাম অনুসারে এ পাখিটির নামকরণ করা হয় টার্কির। ক্রমান্বয়ে পাখিটি ইউরোপসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশে ছড়িয়ে পড়ে। টার্কির পালন বেশি জনপ্রিয় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জামার্নি, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড ও ব্রাজিলে। পাখির মাংস হিসেবে টার্কির মাংস মজাদার এবং কম চবির্যুক্ত, সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর। সারা বিশ্বে এখন টার্কির মাংস বেশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশে টার্কির মাংস এখনো জনপ্রিয়তা পায়নি। অনেকে ধারণা করছেন, পোল্ট্রির পাশাপাশি টার্কির মাংস দেশে আমিষের চাহিদা পূরণে ভুমিকা রাখতে পারে। আবার গরু বা খাসির মাংসের বিকল্প হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জামার্নি, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড ও ব্রাজিলের জনগণের কাছে টার্কির মাংস বেশি জনপ্রিয়। জানা গেছে, ব্রাজিল ২০১৫ সালে ১ লাখ ৩২ হাজার ৯০০ টন টার্কির মাংস রপ্তানি করে।

টার্কির পাখির খাবার

বন্য টার্কির সাধারণত বনভুমিতে পানির কাছাকাছি এলাকায় থাকতেই বেশি পছন্দ করে। ফসলের বীজ, পোকামাকড় এবং মাঝে মাঝে ব্যাঙ কিংবা টিকটিকি খেয়েও এরা জীবনধারণ করে। অন্যান্য পাখির তুলনায় টার্কির জন্য বেশি ভিটামিন, প্রোটিন, আমিষ, মিনারেলস দিতে হয়। মাটিতে খাবার সরবরাহ করা যাবে না। সবসময় পরিষ্কার পানি দিতে হবে। খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গৃহপালিত বা খামারে যারা টার্কির পালন করেন, তারা মোট খাবারের ৫০ ভাগ সবুজ ঘাস, শাক (পালং, সরিষা, কলমি, হেলেঞ্চা, সবুজ ডাঁটা, কচুরিপানা দিতে পারেন)। তবে শাক অবশ্যই কীটনাশকমুক্ত হওয়া আবশ্যক। একটি আদর্শ খাদ্য তালিকা দেয়া হলো : ধান ২০ শতাংশ, গম ২০ শতাংশ, ভুট্টা ২৫ শতাংশ, সয়াবিন মিল ১০ শতাংশ, ঘাসের বীজ ৮ শতাংশ, সূযর্মুখী বীজ ১০ শতাংশ, ঝিনুক গুঁড়া ৭ শতাংশ, মোট ১০০ শতাংশ। নিবিড় পদ্ধতিতে ড্রাই ম্যাশ হিসেবে মোট খাদ্যের ৫০ শতাংশ পযর্ন্ত সবুজ খাবার দেয়া যায়। সব বয়সের টার্কির জন্য টাটকা লুসার্নর প্রথম শ্রেণির সবুজ খাদ্য।

সহযোগিতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বাংলাদেশে টার্কির পালনে আগ্রহীদের জন্য সুখবর দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বেশ লাভজনক এ পাখি পালনের জন্য আগ্রহীদের এখন থেকে ঋণ দেয়া হবে। খামারিদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ও পল্লীঋণের নতুন নীতিমালায় এ পাখি পালনে ঋণ দেয়ার বিষয়টি অন্তভুর্ক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিমালাটি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, টার্কির পালনে উন্নত অবকাঠামো দরকার হয় না। তুলনামূলক খরচও কম। বতর্মানে বাণিজ্যিকভাবে খামার করে টার্কির পালনে লাভবান হচ্ছেন খামারিরা। এটি মাংসের চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি কমর্সংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের অথর্নীতিতে ভুমিকা রাখছে। তাই এ খাতে ঋণ সহায়তা দেয়া যেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন