সোমবার, ১৫ অগাস্ট ২০২২ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯

স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন পাগলা জামে মসজিদ



শত বছরের পুরনো স্থাপত্য নিদর্শন দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পাগলার রায়পুর বড় মসজিদ। ‘মহাশিং নদী’র কূল ঘেঁষে রাজকীয় মহিমায় দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক এ মসজিদ যে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যকলা আর যথার্থ পরিবেশপাঠ এর মহিমাকে বৃদ্ধিই করে শুধু। প্রবহমান মহাশিং-এর এক বাকসংলগ্ন কূলে দাঁড়িয়ে যেনো সভ্যতার ক্রমবিকাশ পর্যবেক্ষণ করছে। মসজিদের সামনে বিশাল ঈদগাহ ময়দান। উত্তরপার্শ্বের গেট দিয়ে ঢুকতেই বাতাসের শীতল ঝাপটা গায়ে লাগে। আমার মনে পড়ে তোঘলক স্থাপত্যের নানান নিদর্শনের কথা; বিশেষত কলকাতার ‘টিপু সুলতান মসজিদ’-এর কথা। ভারতের বিভিন্ন শহরে মোঘল স্থাপত্যকলার যে সব মসজিদ রয়েছে, আমি এখানেও সেসবের বাস্তব রূপায়ণ দেখি। তবে এর অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই ঘরানার অন্যান্য মসজিদগুলো সাধারণত এক তলাবিশিষ্ট হয়, কিন্তু এটি দু’তলাবিশিষ্ট। কিন্তু এমন এক ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন এখনো সরকারের প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তরের গোচরে আসেনিÑ জেনে বিস্মিত হই।
১৩৩১ বঙ্গাব্দের ৫ই আশ্বিন শুক্রবার মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। আশ্চর্যের বিষয়, কোনো ধরনের  রডের ব্যবহার ছাড়াই সম্পূর্ণ ইটের উপর নির্মিত এই স্থাপনাটি দ্বি-তলা বিশিষ্ট। জানা যায়, মসজিদটির নির্মাণকাজে মূল মিস্ত্রিসহ জোগালিরা ছিলেন ভারতীয়। মূল স্থপতির নাম ‘মুমিন আস্তাগার’যার পূর্বপুরুষ ভারতের তাজমহলে কাজ করেছেন বলে জানা যায়। সে সময়ে তিনি ঢাকায় আবাস গড়েছিলেন। প্রায় দশ বৎসর যাবত নির্মাণকাজ চলে। ৬৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও বারান্দাসহ ২৫ ফুট প্রস্থের মসজিদটির গম্বুজসহ মোট উচ্চতা ৪০ ফুট। ছয়টি স্তম্ভের উপর ছয়টি মিনার, তিনটি বিশাল গম্বুজ এবং ছোট সাইজের আরোও বারোটি মিনার রয়েছে মসজিদটিতে। ভূমিকম্প নিরোধক ব্যবস্থা হিসেবে ভূমি খনন করে বেশ মজবুত পাতের উপর স্থাপনাটির ভিত নির্মিত। ফলে অনেকগুলো বড় মাপের ভূমিকম্পও এখন পর্যন্ত মসজিদটিতে ফাটল ধরাতে পারেনি। নির্মাণের পর এখনও বড় ধরনের কোনো সংস্কারের প্রয়োজন পড়েনি। অবশ্য কেবল গম্বুজের এক জায়গায় খানিকটা লিকেজ দেখা দিয়েছিল আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে। তখন গম্বুজের উপরের দিককার কিছু পাথর পরিবর্তন করতে হয়েছিল। বিশেষজ্ঞ স্থপতিদের তত্বাবধানে বেশ সতর্কতার সাথে সংস্কার কাজ সম্পাদন করা হয়েছে, যাতে মূল আদলে কোনরূপ পরিবর্তন না ঘটে।

মসজিদের ভিতরকার দৃশ্য আরো বেশি নান্দনিক। নামাজের জন্য নির্ধারিত মূল স্থান দু’তলায়। সেখানকার ফ্লোর ও তার আশপাশের কারুকার্য দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। মিহরাব অংশে জমকালো পাথর কেঁটে আকর্ষণীয় ডিজাইন তোলা হয়েছে। পুরো মসজিদের চারপাশে তিনফুট উচ্চতা পর্যন্ত যে কারুকার্যখচিত টাইলস লাগানো হয়েছে সেটাও উঁচুমানের স্থাপত্যশৈলীর ইঙ্গিত দেয়। টাইলসগুলো হয়েছে ইতালি, জার্মানি ও ইংল্যান্ড থেকে আনা। প্রত্যেকটা প্রবেশদ্বারে পাথরখচিত খিলান মসজিদটিকে বেশ দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। নিচতলার ছাদ ঢালাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে রেলের স্লিপার। ছাদ ও গম্বুজের চারপাশে পাথর খোদাই করা পাতার ডিজাইন গ্রামীণ ঐতিহ্যের জানান দেয়। মুসল্লিদের সুবিধার্থে ছাদের উপর গম্বুজের সামনের দিকে বিশাল পানির হাউজও রয়েছে।

‘দু’তলার মেঝেতে রয়েছে দুর্লভ শ্বেতপাথর, তার চারপাশে ব্লকে দেয়া ‘ব্ল্যাক স্টোন’ বা কালোপাথর তো আরো বেশি দুর্লভ। এগুলো আনা হয়েছে ভারতের জয়পুর থেকে। তখনকার অবিভক্ত ভারতের সাথে নদীপথের যোগাযোগই সহজ ছিলো। তাই স্বাভাবিকভাবেই মসজিদটি নদীর কূল ঘেঁষে নির্মিত। মুসল্লিরা সবসময়ই একটা তাপমাত্রাবান্ধব অনুভূতি পান নামাজের সময়। এই জাতের পাথর একমাত্র তাজমহলে ব্যবহার করা হয়েছে। দেশে আর কোথাও এ ধরনের পাথর ব্যবহৃত হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই’। এমনটাই বলছিলেন মসজিদের উদ্যোক্তা ইয়াসিন মির্জার পৌত্র মনজুর হায়দার।
এবার আসি মূল কর্তা ব্যক্তি ‘ইয়াসিন মির্জা’-র কথায়। তিনি ও তাঁর ভাই ইউসুফ মির্জা মিলে মসজিদটি নির্মাণ করেন। বেশ বিত্তবান এবং ধর্মপরায়ণ ছিলেন তাঁরা। চাষাবাদ ও খামারের বিশাল সম্পত্তির মালিক ছিলেন। মসজিদ নির্মাণের পিছনে মূল কারণ কী ছিলো। সে সম্পর্কে লোকমুখে নানান জনশ্রুতি থাকলেও পরিবারের সূত্রে জানা যায়, ইয়াসিন মির্জার পিতা ‘আদিল হাজী’ ছিলেন বেশ ধার্মিক। তখনকার সময়ে মুসলমানরা ছিলেন সংখ্যালঘু। পুরো পরগনার মধ্যে তিনিই একমাত্র হাজী ছিলেন। আদিল হাজীকে সবাই ‘পায়ে হেঁটে হজ্বপালনকারী’ হিসেবে জানতো। ধর্মকর্মের প্রতি তাঁর অগাধ মনোনিবেশ থেকে তিনি বর্তমান মসজিদের জায়গাটিতে একটি টিনশেড ঘর তৈরি করেন নামাজের জন্য। আশপাশের গ্রামের মুসলমানরাও এখানে এসে নামাজ আদায় করতেন। পরম্পরাগত ঐতিহ্যের সূত্র ধরেই ইয়াসিন মির্জার মসজিদ নির্মাণের স্বপ্ন জাগে। যে ব্যাপক স্থাপত্য নক্সা তিনি হৃদয়পটে এঁকেছিলেন, তাতে মসজিদের নিচতলায় হিফজখানা আর উপরের তলায় নামাজের স্থান নির্ধারিত ছিলো। মসজিদের বাহিরের অংশকে সবচে’ বেশি আকর্ষণীয় করার অভিপ্রায় ছিল ইয়াসিন মির্জার। বাহিরের অপরূপ শৈলী যেনো সর্বসাধারণকে মসজিদে আসতে উদ্বুদ্ধ করে। এমন প্রত্যাশা ছিলো তাঁর মন-মগজে। কিন্তু সে স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়নের মুখ দেখার আগেই তার সময় চলে আসে পৃথিবী থেকে পাততাড়ি গোটানোর। বাহিরের নক্সা আর বাস্তবায়িত হয়নি। তবে তিনি ওসীয়ত করে যান, তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী মসজিদের কাজ পুরোপুরি বাস্তবায়িত করার আগে যেন তাঁদের কবর; এমনকি ঘরবাড়ী পর্যন্ত পাকা করা না হয়। কিন্তু সেটুকু আর হয়ে ওঠেনি। দু’ ভাইয়ের কবরও আজ পর্যন্ত কাঁচা বেড়া-বাউন্ডারীহীন রয়ে গেছে।

দুঃখের সাথে বলতে হয়, স্থাপত্যকীর্তিটি এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে সরকারী আনুকূল্য পায়নি। মসজিদের মূল রাস্তাটি এখনও পাকা করা হয়নি। অবশ্য মসজিদের সামনের ঈদগাহ ও বাউন্ডারী নির্মাণের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে একটা আর্থিক অনুদান পাওয়া গিয়েছিল। আনুষঙ্গিক কাজগুলো মসজিদের নিজস্ব ফান্ড বা চাদা কালেকশনের মাধ্যমে সম্পাদন করা হয়। সরকারের তরফ থেকে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ পেলে ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটি পর্যটন শিল্পে একটা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারতো। আর যদি অবহেলার ধারাবাহিকতায় দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়তে থাকে, তবে সেটা হবে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর বা কর্তৃপক্ষের বসন থেকে এক এক টুকরা বসন খসে পড়ার মতো।

সংবাদটি শেয়ার করুন