সোমবার, ১৫ অগাস্ট ২০২২ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯

আজ ১০ মহররম, পবিত্র আশুরা



আজ ১০ মহররম, পবিত্র আশুরা। ৬১ হিজরির এ দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন রা: ও তার পরিবারের সদস্যরা ইয়াজিদের সৈন্যদের হাতে কারবালার ময়দানে শহীদ হন। ঈমানের বলে বলীয়ান এবং সত্য ও ন্যায়ের পে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে থেকে নির্ভীকভাবে শাহাদতের অমীয় সুধা পান করে বিশ্ব ইতিহাসে চির অমর হয়ে আছেন ইমাম হোসাইন রা:। এ শাহাদতের মধ্য দিয়ে তিনি সত্যের জন্য আপসহীন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার এবং প্রয়োজনে জান কোরবান করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, যা বিশ্ব মুসলিম মননকে যুগে যুগে প্রেরণা জুগিয়ে আসছে।
তবে ইসলামের ইতিহাসে তথা সৃষ্টির শুরু থেকে নানা ঘটনায় এ দিবসটি তাৎপর্য সংক্ষেপে বর্ণনা করা দুরূহ বিষয়। সে কারণে বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বে যথাযোগ্য মর্যাদায় পবিত্র আশুরা পালিত হবে। নফল রোজা, নামাজ, জিকির-আজকারের মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা দিনটি পালন করবেন। হজরত মুহাম্মদ সা: আশুরার দিনসহ দু’দিন রোজা রাখার কথা বলেছেন। এ উপলক্ষে দেশব্যাপী বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। পুরান ঢাকার হোসেনি দালানসহ বিভিন্ন স্থান থেকে শিয়া সম্প্রদায়ের উদ্যোগে তাজিয়া মিছিল বের হবে।
আশুরা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ পৃথক বাণী দিয়েছেন। এবার পবিত্র আশুরার দিন শুক্রবার। তবে অন্য সময়ও এ দিন সরকারি ছুটি থাকে। এ দিবস উপলক্ষে সংবাদপত্রে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া দিবসটিতে বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে। পবিত্র আশুরা উপলক্ষে পত্রিকা অফিস বন্ধ থাকবে।
কারবালার ঘটনা : ইয়াজিদ ইসলামী শাসনব্যবস্থার ব্যত্যয় ঘটানোয় হুসাইনের রা: পে সেটা মেনে নেয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। খিলাফত ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবনই ছিল ইমাম হোসাইনের রা: সংগ্রামের মূল্য। মুসলিম জাহানের বিপুল মানুষের সমর্থনও ছিল তার । উপরন্তু কুফাবাসী ইয়াজিদের অপশাসনের হাত থেকে বাঁচার জন্যে বারবার ইমাম হোসাইনের সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকলে তিনি তাতে সাড়া দেন। তিনি কুফা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কুফার অবস্থা জানার জন্যে হোসাইন রা: তার চাচাতো ভাই মুসলিম-বিন-আকিলকে সেখানে পাঠান। আকিল কুফাবাসীর সাহায্যের আশ্বাস পেয়ে ইমাম হোসাইনকে কুফায় আসতে অনুরোধ করে পত্র লিখেন। কিন্তু এর মধ্যে ইয়াজিদের অধীনস্থ ইরাকের শাসনকর্তা কঠিন হৃদয়ের ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ আকিলকে খুঁজে বের করে তাকে হত্যা করে এবং তাকে সহায়তাকারীদেরও খুঁজে হত্যা করে। এতে কুফাবাসীরা ভীত হয়ে পড়েন। তারা হোসাইন রা:-এর সাহায্যে এগিয়ে আসতে আর সাহস পেল না। কুফাবাসীরা ইমাম হোসাইন রা:-কে খলিফা হিসেবে দেখতে চাইলেও ইমাম হোসাইন রা:-এর জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতে রাজি ছিল না। ইয়াজিদের নির্মমতার কথা জেনেও ইমাম হোসাইন রা:-এর সঙ্গীরা যে জেনেশুনে বুঝেই ইমামের সাথে যোগ দিয়েছিলেন তা খুবই স্পষ্ট। ইমাম রা:-কে ভালোবেসে, তার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস রেখেই তারা ইমামের রা: সাথে থেকে প্রাণপণে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন। ইমাম হোসাইন রা: এবং তার সঙ্গীদের ওপর যে আঘাত হানা হয়েছে, তরবারির সেই আঘাতের যন্ত্রণার চেয়ে আরো বেশি কষ্টকর ছিল জনগণের অজ্ঞতা এবং মূর্খতার আঘাত। সেজন্যই জনতার অজ্ঞতাপ্রসূত ভাবনার পর্দা অপসারণ করাই ছিল তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আকিলের পাঠানো পত্র পেয়ে ইমাম হোসাইন স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, আত্মীয়স্বজন, সহযোগীসহ কুফার পথে রওনা হন। কুফার ইয়াজিদ বাহিনীর সেনাপতি ওমর হোসাইন রা:-কে ইয়াজিদের আনুগত্যের শপথ গ্রহণের নির্দেশ দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে তারা ফোরাত নদীর তীর ঘিরে দণ্ডায়মান হলো এবং হোসাইন রা: শিবিরের পানি সরবরাহ পথ বন্ধ করে দিলো।
আশুরার দিনে কারবালার পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে ধাবিত হতে থাকে। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ইমামের রা: সঙ্গীরা ঈমানের বলে বলীয়ান হয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছিলেন। অবশেষে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের চার হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী ইমাম হোসাইন রা:-কে অবরুদ্ধ করে ফেলে এবং ফোরাত নদীতে যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দেয়। পানি সরবরাহের পথ বন্ধ করে দেয়ায় ইমামের রা: কচি সন্তানেরা প্রচণ্ড তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়লে হজরত আব্বাস রা: ফোরাতে যান পানি আনতে। নিজেও তিনি ভীষণ তৃষ্ণার্ত ছিলেন। আঁজলা ভরে পানি তুলে খেতে যাবেন এমন সময় তার মনে পড়ে যায় ইমাম হোসাইন রা:-এর তৃষ্ণার্ত শিশু সন্তানের কথা। পানি ফেলে দিয়ে মশক ভর্তি করে তাঁবুর উদ্দেশে রওনা দিতেই শত্রু পরে আঘাতে তার এক হাত কেটে যায়। মশকটাকে তিনি অপর হাতে নিয়ে ইমামের রা: তাঁবুর দিকে ছুটলেন। এবার অপর হাতটিও কাটা পড়ে। মশকটাকে এবার তিনি মুখে নিয়ে তাঁবুর দিকে যেতে চাইলেন। শত্রুর তীর এবার সরাসরি তার দেহে আঘাত হানে। এভাবে শহীদ হয়ে যান তিনি। এরপর অসম এ যুদ্ধে একে একে ৭২ জন শহীদ হন।
ইতিহাস স্যা দেয়, দুরাবস্থায় পতিত হয়ে হোসাইন রা: ওবায়দুল্লাহর কাছে তিনটি প্রস্তাবের যেকোনো একটা গ্রহণের অনুরোধ জানান। তাহলো হয় তাকে মদিনায় ফেরত যেতে দেয়া হোক, কিংবা তুর্কি সীমান্তের দুর্গে অবস্থান করতে দেয়া হোক, বা ইয়াজিদের সাথে আলোচনার জন্য দামেস্কে যেতে দেয়া হোক। কিন্তু মতাদর্পী ওবায়দুল্লাহ এর কোনোটাই মানল না। এ দিকে ১০ দিন অবরুদ্ধ থাকার কারণে পানির অভাবে হোসাইন রা:-এর শিবিরে হাহাকার পড়ে গেল। ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ অক্টোবর কারবালার প্রান্তরে এক অসম যুদ্ধ শুরু হলো। হোসাইনের রা: ভ্রাতুষ্পুত্র কাশিম শত্রুর আঘাতে শাহাদতবরণ করলেন। তৃষ্ণার্ত হোসাইন রা:-এর শিশুপুত্র আসগরকে কোলে নিয়ে ফোরাত নদীর দিকে অগ্রসর হলেন; কিন্তু ইয়াজিদ বাহিনীর নিপ্তি তীর শিশুপুত্রের শরীরে বিদ্ধ হয়ে শিশুপুত্রটি শাহাদতবরণ করলে একাকী অবসন্ন হোসাইন রা: তাঁবুর সামনে বসে পড়লেন। সীমার নামে ইয়াজিদের এক সৈন্য তরবারির আঘাতে হোসাইন রা:-কে নামাজরত অবস্থায় মস্তক শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলো। এক পর্যায়ে হোসাইন রা: পরিবারের জীবিত সদস্যদের বন্দী করে দামেস্কে ইয়াজিদের কাছে পাঠানো হয়। এ দিকে হোসাইন রা:-এর শাহাদতের ঘটনা দেশের মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলল। ইয়াজিদ ভয় পেয়ে গেল। মতা নিরাপদ রাখতে এবং জনরোষের ভয়ে কৌশলী ভূমিকা নিয়ে সে বন্দীদের মুক্ত করে মদিনায় পাঠিয়ে দিলো।
তবে সেখানেই কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার শেষ হয়। ত্যাগের মহিমায় সমুন্নত কারবালার শিক্ষা ন্যায়ের পথে পথিকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন